এক
পাশে বিস্তীর্ণ বালুময় প্রান্তর, আরেক পাশে বিশাল পাহাড়ের সারি। হঠাৎ
দেখলে মনে হয়, সবুজ আঁচল ছড়িয়ে আছে পাহাড়গুলো! সেই পাহাড়ের ওপর শরতের নীল
আকাশ। পাহাড় আর বালুময় প্রান্তরের মধ্য দিয়ে ছুটে চলেছে টলটলে জলের ধারা।
এই ধারায় পা ভিজিয়ে একটু এগিয়ে গেলেই কানে আসে জলের পতনের শব্দ। পাথুরে
উঁচু পাহাড় থেকে সবুজ গাছের ফাঁক দিয়ে এই ধারা গড়িয়ে নামছে বাঁধনহারার মতো।
সব মিলিয়ে প্রকৃতির মায়াবী এক রূপ; এ জন্যই হয়তো নাম হয়েছে মায়াবী ঝর্ণা!
আর এই মায়াবী রূপের মায়ায় মাতোয়ারা পর্যটকরা।
সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার জাফলং অনেক দিন
ধরেই পর্যটকের কাছে অন্যতম আকর্ষণ। প্রতিদিন হাজার হাজার প্রকৃতিপ্রেমী
ছুটে আসেন সীমান্তের ওপারের পাহাড় থেকে নেমে আসা পিয়াইন নদীতে অবগাহন করে
শরীর-মন জুড়াতে। সেইসঙ্গে স্বচ্ছ জলের মাঝে পাথরের রূপের সঙ্গে সীমান্তের
ওপারে ঝুলন্ত সেতু দেখার সুযোগ তো আছেই। সাম্প্রতিক সময়ে পিয়াইনের সেই রূপে
ভাগ বসিয়েছে কয়েকশ’ গজ দূরের মায়ারী ঝর্ণা। জাফলংয়ের প্রধান আকর্ষণ এখন
যেন স্থানান্তরিত হয়েছে এই ঝর্ণায়!
ঢাকা
থেকে সপরিবারে ছুটে আসা উন্নয়নকর্মী আল-আমিনের কথায় মিলল এর প্রমাণ। তিন
বছরের একমাত্র মেয়েকে মায়াবী ঝর্ণার জলে সিক্ত করার ফাঁকে বললেন, ‘জাফলংয়ে
আগে কয়েকবার এসেছি; বন্ধুবান্ধব-পরিবার নিয়েই। প্রতিবার পিয়াইন নদীর
পাথররাজ্য ও ঝুলন্ত সেতুতে মন ভরেছে। কয়েক দিন আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে
মায়াবী ঝর্ণার ছবি দেখি। তাই পরিবার নিয়ে চলে এসেছি ঝর্ণার মায়ার টানে।’
জাফলংয়ের বল্লাঘাটের জিরোপয়েন্ট থেকে একটু
এগিয়ে গেলেই মায়াবী ঝর্ণা। সীমান্তের ওপারে ভারতের মেঘালয় পাহাড় থেকে আছড়ে
পড়ছে স্বচ্ছ জলরাশি। চারদিকে সবুজের মাঝে পাথরের বুকে কলকল শব্দে গড়িয়ে
নামছে এই ধারা। সেই ধারা পিয়াইনের মূল নদীতে যাওয়ার পথে বালু ও হরেক রকমের
নুড়ি-পাথরের মাঝ দিয়ে পথ করে নিয়েছে। এই পথে পা ভিজিয়ে শত শত পর্যটক মূল
ঝর্ণার নিচে এসে মেতে ওঠেন জলকেলিতে। ঝর্ণার শব্দের সঙ্গে কানে সংগীতের সুর
শুনিয়ে যায় সবুজ গাছের ওপরে নাম না জানা অদেখা পাখি।
দুই দেশের সীমান্তের নো ম্যান্স ল্যান্ডে
অবস্থান হলেও মায়াবী ঝর্ণায় যেতে নেই কোনো বাধা। চাকরির সুবাদে টাঙ্গাইলে
থাকেন আতিকুর রহমান। এবার কোরবানির ঈদের ছুটিতে গোয়াইনঘাটের গ্রামের বাড়িতে
এসে বন্ধুদের সঙ্গে গিয়েছিলেন মায়াবী ঝর্ণা দেখতে। তিনি বলেন, সবুজের
সমারোহে পাহাড়ের গা থেকে নেমে আসা এই ঝর্ণাধারা দেখে এত ভালো লেগেছে যে বলে
বোঝাতে পারব না।
একসময় জাফলংয়ে এসে সবুজে ঢাকা বিশাল বিশাল
পাহাড়, পাথর আর স্বচ্ছ জলরাশিতেই মুগ্ধ হতেন পর্যটক। ইদানীং মায়াবী ঝর্ণা
নতুন করে জাফলংয়ের প্রতি মানুষের আকর্ষণ বাড়িয়েছে। অন্তত ৩০০ ফুটের মতো
উঁচু এই পাহাড়ি ঝর্ণার পিচ্ছিল পাথর বেয়ে ঝুঁকি নিয়ে অনেকেই ওপরে ওঠেন।
কয়েক ধাপে এই ঝর্ণার কিছু উপরে উঠে তারা সেলফি তোলেন, শীতল জলধারায় গা
ভেজান। কিন্তু প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখতে এসে এমন অনিয়ন্ত্রিত আচরণে যে কোনো
সময় অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটার শঙ্কার কথা জানালেন ব্যাংক কর্মকর্তা মো.
শাহজাহান।
জাফলংয়ের জিরোপয়েন্ট থেকে মিনিট ১৫ হেঁটেই
পেঁৗছা যায় মায়াবী ঝর্ণায়। মাঝে নৌকায় করে খরস্রোতা পিয়াইন নদী পেরোতে
হবে। মায়াবী ঝর্ণার পাশেই রয়েছে সংগ্রামপুঞ্জি। সুযোগ করে সবুজের হাতছানিতে
ওখানেও ঢুঁ মারছেন পর্যটক। স্থানীয় ব্যবসায়ী আবদুল মান্নান বলেন, মায়াবী
ঝর্ণা জাফলংয়ে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে। একটু নজর দিয়ে পর্যটকদের
সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর ব্যবস্থা করলে পানি-পাথরের রাজ্যের নতুন সংযোজন এ
ঝর্ণার মায়ায় দেশ-বিদেশের পর্যটকের ঢল বাড়বে। সূত্র: সমকাল







0 comments:
Post a Comment